fbpx
skip to Main Content
গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক : দৈহিক ও মানসিক পরিবর্তনসমূহ
Post Series: গর্ভকালীন ত্রৈমাসিকসমুহ

কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখেছেন কখনো?  নিঃসন্দেহে আপনাদের উত্তর হ্যা-বোধকই হবে। কিন্তু ভালোভাবে খেয়াল করে দেখেছেন কি এর কতরকম রূপ থাকে। একটা সময় আসে গাছ ভর্তি কচি সবুজ পাতা, এর পরে সেই গাছে কলি আসে, তারপর সবুজের ফাঁকে ফোঁকরে রক্তলাল ফুল অল্প অল্প করে উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে। অবশেষে একটা সময় আসে সবুজ গাছ লাল ফুলে ঢেকে যায়, সবুজের দেখা মেলা ভার। 

অবাক হচ্ছেন নিশ্চয়ই আচমকা কৃষ্ণচূড়া গাছের এমন ব্যবচ্ছেদ কেন করছি। একটু বোঝানোর সুবিধার্থে। গর্ভধারণেরর সময়টা তো আসলে কৃষ্ণচূড়া গাছের মতই নানা রূপের। এর আগে আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরেছিলাম প্রথম ট্রাইমেস্টার এর কথা। আজ নিয়ে এসেছি দ্বিতীয় ভাগ।  

গর্ভধারণের এই পুরো ম্যাজিক্যাল সময়কালটিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে ১৩ থেকে ২৭ সপ্তাহ পর্যন্ত সময়কে বলা হয়ে থাকে দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার। 

এসময়টাতে বাচ্চা বেশ বড়সর, সক্রিয় এবং শক্তিশালী হয়ে উঠে। বেশিভাগ নারীদের ক্ষেত্রেই প্রেগন্যান্সির এই সময়কালটিই হচ্ছে সবচাইতে আরামদায়ক সময়। আরামদায়ক হলেও এসময়টাতেও অবশ্যই সাবধান আর সচেতন থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহ অনুযায়ী শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলো জানা থাকলে ভবিষ্যত পরিকল্পনা করা আর পরিবর্তনগুলোতে ঘাবড়ে যাওয়া এড়াতে পারবেন খুব সহজেই।

সেকেন্ড ট্রাইমেস্টারে দৈহিক পরিবর্তনসমূহ:

দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে পদার্পণের পর থেকে আপনার প্রথম ট্রাইমেস্টারে হওয়া সিম্পটোমগুলোর দ্রত উন্নতি ঘটতে থাকবে। বেশিভাগ নারীদের ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের সময়টাতে বমি বমি ভাব আর শারীরিক অবসাদ একেবারেই কমে যায়। 

এসময়ে নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেয়ে থাকে:

  • জরায়ু প্রসারিত হয়
  • তলপেট বড় হয়ে যাওয়া 
  • লো ব্লাড প্রেসারের কারণে মাথার ভেতর শুণ্যতা অনুভব করা ও হালকা মাথা ঘোরানো
  • বাচ্চার নড়াচড়া অনুভূত হওয়া 
  • শরীরে ব্যাথা অনুভব করা 
  • ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া 
  • পেট, স্তন, উরু এবং নিতম্বে স্ট্রেচ মার্ক হওয়া
  • স্তনের বোঁটার কাছে কালচে হয়ে যাওয়া অথবা ছোপ ছোপ দাগ হওয়া , মাঝেমধ্যে চুলকানো 
  • পায়ের গোড়ালি এবং হাত ফুলে যাওয়া 

সেকেন্ড ট্রাইমেস্টারে মানসিক পরিবর্তনসমূহ:

সেকেন্ড ট্রাইমেস্টারের সময়টাতে ক্লান্তি আর অবসাদের সমস্যাটা থেকে বেশ ভালোভাবেই নিস্তার পাওয়া যায়। তাই এসময়টাকে পুরো গর্ভধারণের মধ্যে সবচাইতে আরামদায়ক সময় বলেই মনে হয় অনেকের কাছে। তাই এসময়টাতে নিজেকে প্রস্তুত করা ও গর্ভধারণ ও পরবর্তী ধাপসমূহ নিয়ে পড়াশোনা করে সময় কাটানোই উত্তম। 

প্রসববেদনা, বাচ্চার ডেলিভারি ও এর পরবর্তী অবস্থা এসমস্ত নিয়ে আপনার মাঝে নানা রকম দুশ্চিন্তা ও অবসাদ ভর করতে পারে। প্রসব বেদনা উঠলে কিভাবে হাসপাতালে যোগাযোগ করবেন। আপনার হাজব্যান্ড আপনাকে কিভাবে নিয়ে যাবেন কিংবা তিনি বাইরে থাকলে কি করে ফিরবেন এসমস্ত পরিকল্পনা আগে ভাবেই দুজন মিলে ঠিক করে রাখতে পারেন, তাহলে এসব দুশ্চিন্তা কিছুটা হলেও আপনাকে বারবার তাড়া করে বেড়াবে না। 

গর্ভাবস্থায় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ এসম্পর্কে অজ্ঞতা। তাই এব্যাপারে ভালো করে জ্ঞান লাভ করুন, দেখবেন ব্যাপারটাকে সহজ, স্বাভাবিক ও সুন্দর ভাবে ভাবতে শিখবেন। 

দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে ভ্রূণের অবস্থা:

এসময়টাতে শিশুর দেহের সব অঙ্গগুলো বিকশিত হয়, এমনকি মাথার চুলও গজিয়ে যায় এসময়টাতেই।  বাচ্চা প্রথম শব্দ শুনতেও শুরু করে এসময়টাতেই। দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের শেষ দিকে বাচ্চা নড়াচড়া করতে শিখে যায় এবং একটি নির্দিষ্ট রুটিন অনুযায়ী ঘুমায় আর জেগে উঠে। 

অ্যামেরিকান প্রেগন্যান্ট এসোসিয়েশনের মতে দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের সময়ে বাচ্চা ১৪ ইঞ্চি পর্যন্ত বেড়ে ওঠে আর ওজন হয় প্রায় দু পাউণ্ডের কাছাকাছি। 

জন্মপূর্ব যত্ন ও চেক-আপ:

দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে প্রতি দুই অথবা চার সপ্তাহ পর পর ডাক্তারের কাছে চেক-আপ করানো উচিত। এসময়ে সাধারণত শিশুর গ্রোথ আর স্বাস্থ্যগত অন্য কোন ত্রুটি আছে কিনা তা নির্ণয় করা হয়। নিয়মিত ওজন এবং ব্লাড প্রেসার নেয়া, শরীরের মাপ, জরায়ু পরীক্ষা এসবই এসময়ে প্রধাণত পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।

এসময়টাতে বাচ্চার হার্টবিট নিয়মিত পরীক্ষা করে শুনে দেখা হয়। প্রয়োজনে আল্ট্রাসাউন্ড ও অন্যান্য স্ক্রিনিং করার পরামর্শও ডাক্তারেরা এসময়ে দিতে পারেন। 

যেকোন ধরণের দুশ্চিন্তা বা সিম্পটোম নিয়ে ভাবনা আপনার মাথায় এলেই তা ডাক্তারের সাথে কথা বলে নিন। মনে রাখবেন ডাক্তারের কাছে যাবার মূল লক্ষ্যই এসময়গুলোতে নিজেকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখা।

দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের খাদ্য তালিকা কেমন হওয়া উচিত:

পূর্ণবয়স্ক একজন মহিলার সাধারণত দৈনিক ২২০০ ক্যলরি খাদ্য প্রয়োজন। কিন্তু গর্ভাবস্থায় আপনাকে মনে রাখতে হবে আপনি একজন নন, দুজনের খাবার খাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে ২০০-৩০০ ক্যালরি খাবার বেশি আপনার প্রয়োজন। তাই মোটামুটি ২৫০০ ক্যালরি খাবার আপনার এসময়ে প্রয়োজন। সেই সাথে ভিটামিন ডি, ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড ও পর্যাপ্ত আয়োডিন প্রয়োজন আপনার ও আপনার স্বাস্থ্যের সুরক্ষায়। কারণ  ভিটামিন ডি আর ওমেগা ৩ বাচ্চার মস্তিষ্ক ও চোখের গঠনে আর এসময়ে বাচ্চার থাইরয়েড গ্ল্যান্ড কাজ শুরু করে দেয়ায় তার প্রচুর আয়োডিনও দরকার পরে।  

ক্যালসিয়াম অন্যতম প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি উপাদান এসময়ে। কারণে এটি বাচ্চার হাঁড় ও মাংসের বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। দুধ, দই, চীজ এ প্রচুর ক্যালসিয়াম পাবেন। 

পুষ্টিকর খাদ্যের পাশাপাশি এ সময়ে বেশ কিছু মিনারেল ও ভিটামিন নির্দিষ্ট পরিমাণে ডাক্তারের পরমার্শ অনুযায়ী খেতে হয়। নীচে সেগুলোর নাম ও পরিমাণ দেয়া হলো।

ক্যালরি – ২৫০০ কিলোক্যালরি, পাওয়া যায় প্রোটিন, ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেট থেকে

প্রোটিন – ৬০ মিলিগ্রাম, মাছ, মাংস, ডিম, দুধে থাকে

আয়রণ – ৪০ মি.গ্রা, মাছ, ডিম, কচুতে থাকে

ক্যালসিয়াম – ১০০০ মি.গ্রা, দুগ্ধজাত খাদ্যে থাকে

জিংক – ১৫ মি.গ্রা, মাছ, ডিম ও সামুদ্রিক খাবারে থাকে

আয়োডিন – ১৭৫ মাইক্রোগ্রাম, আয়োডিনযুক্ত লবণ ও সামুদ্রিক খাদ্যে থাকে

ভিটামিন এ – ৬০০০ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিট, শাক সবজি, কলিজা ও হলুদ ফলে থাকে

ভিটামিন ডি – ৪০০ আই.ইউ, দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্যে থাকে

থায়ামিন – ১.৫ মি.গ্রা, ঢেঁকিছাটা চালে থাকে

রিবোফ্লাবিন – ১.৬ মি.গ্রা, মাংস, কলিজা থাকে

নিকোটিনিক এসিড – ১৭ মি.গ্রা, মাংস, বাদাম ও শস্য দানাতে থাকে

এসকরবিক এসিড – ৭০ মি.গ্রা, টক জাতীয় ফলমূলে ও টমটোতে থাকে

ফলিক এসিড – ৪০০ মাইক্রোগ্রাম, সবুজ শাকসবজি ও কলিজাতে থাকে

ভিটামিন বি ১২ – ২.২মাইক্রোগ্রাম, প্রাণীজ প্রোটিনে থাকে

এই তো জেনে নিলেন পরীক্ষার দ্বিতীয়ভাগের কথা। পরবর্তিতে আমরা শেষ অধ্যায় নিয়ে হাজির হয়ে যাব আপনাদের সামনে। আপনার এবং আপনার অনাগত সন্তানের জন্য শুভকামনা রইলো।

This Post Has 52 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!